লেখক:শাহজাদা মোহাম্মদ ইমাম উদ্দীন রজায়ী
সাজ্জাদানশীন- ওষখাইন রজায়ী দরবার শরীফ
শেরে খোদার পরিচয়-
আনুমানিক ৫৯৯ সালের ১৭ মার্চ, হিজরী ২৪ পূর্বাব্দের ১৩ রজব মক্কা নগরীর কাবায় আলী (রা:)’র জন্ম। শেরে খোদা মহাবীর হযরত আলী (রাঃ) ছিলেন ইসলামের মহান খোলাফায়ে রাশেদীনের মধ্যে চতুর্থ খলিফা। এছাড়া তার আর একটি শ্রেষ্ঠ পরিচয় ছিলো- তিনি মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সঃ)-এর আপন চাচা সদাশয় মহামতি আবু তালিবের প্রাণ প্রিয় জ্যেষ্ঠ পুত্র। মহানবী (সঃ)-এর সর্বসময়ের সঙ্গী ও অকৃত্রিম বন্ধু। বিপদ-আপদের একমাত্র সহচর।
মহানবীর (সঃ)-এর প্রতিদিনের জীবন ধারার সাথে সদা সর্বদা জড়িত থাকার মহা সুযোগ এবং গভীরভাবে তাকে জানবার সৌভাগ্য একমাত্র আলীরই (রাঃ) হয়েছিলো। সবার উপরে তিনি ছিলেন ধর্মে-কর্মে, জ্ঞানে-বুদ্ধিতে, জ্ঞান-গরিমায়, ত্যাগ সাধনায়, কষ্ট-সহিষ্ণুতায় ও মধুর চরিত্র মহিমায়, মুসলিম জগতের এক অত্যুজ্জ্বল নক্ষত্র এবং শ্রেষ্ঠ আদর্শ।
হযরত আলী সারাটি জীবন মহানবী (সঃ)-এর খেদমতে ও সাহচর্য্যে উৎসর্গ করেছিলেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত সাহসী ও সমরকুশলী। তাঁর মতো নির্ভীক যোদ্ধা, সাহসী বীর ও শক্তিমান পুরুষ তখনকার দিনে আরবে ছিলো না বললেই চলে। কথিত আছে তাঁর বীরত্ব হুঙ্কারে ও পদভারে মাটি পর্যন্ত থরথর করে কেঁপে উঠতো। সমর ক্ষেত্রে, যুদ্ধের প্রাঙ্গনেও তাঁর ওপর ভয়ঙ্কর ‘হায়দারীহাকে’ শত্রুর হৃদয় ভয়ে কম্পমান হয়ে যেতো। থরথর করে কেঁপে উঠতো। কেউবা দিশেহারা হয়ে বিমূঢ় হয়ে যেতো। কেউবা সংজ্ঞাহীন হয়ে ঢলে পড়তো।
যুদ্ধক্ষেত্রে তার বীরত্ব হুঙ্কার, বাহুবল, দুর্দান্ত সাহসিকতা ও অস্ত্রের চাকচিক্যে যে কোন শত্রুই সহজে পরাজর স্বীকারে বাধ্য হতো।
হযরত আলী (রাঃ) ছিলেন ইসলামের একজন সত্যিকারের মহান খাদেম। ইসলামের স্বার্থের জন্য তিনি জীবনের সকল স্বার্থ ত্যাগ করেছিলেন।
জীবনে যা কিছু ক্রোধ, হিংসা ও জিজ্ঞাসা বৃত্তি চরিতার্থ করেছিলেন, তা সবই ইসলামের দৃষ্টি ভঙ্গিতেই, ইসলামের স্বার্থ উদ্ধার করেছিলেন। ইসলামের ক্ষতিসাধনে বা স্বার্থ ব্যাঘাতে যদি কখনও কেউ কোথাও প্রবৃত্ত হতো, তখনই তিনি বজ্রের মতো কঠোরতা নিয়ে তার বিরুদ্ধে এগিয়ে যেতেন। প্রয়োজন হলে হত্যা করে প্রতিশোধ গ্রহণ করতেন।
ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে তিনি বহুদেশের বহু বিধর্মী রাজ্যের বাদশাহর সঙ্গে অকুতোভয়ে যুদ্ধ করেছেন, তাদেরকে পরাজিত করেছেন। বন্দী করেছেন, সত্য ধর্মে দীক্ষিত করেছেন।
বতা রত্ব হুঙ্কারে সমর কৌশলে, বাহুবলের পরাক্রমশীলতায়। শুধু আরব দেশ কেন, পার্শ্ববর্তী সকল দেশের লোক ভয়ে কম্পমান থাকতো।
হযরত আলী একদিকে ছিলেন বীর যোদ্ধা, শক্তিমান পুরুষ, অন্যদিকে ছিলেন ন্যায়-ধর্মী, সত্যাশ্রয়ী মহান শাসক। সুবিচার, সু-নীতি আর সৎ প্রবৃত্তিই ছিলো তার জীবনের একমাত্র আদর্শ।
পারিবারিক জীবনের সুখ স্বাচ্ছন্দের চেয়ে তিনি ইসলামের মঙ্গল-প্রসারের কথাই অধিক ভাবতেন। তাঁর সরলতার ও উদারতার বহু নজীর পাওয়া যায়।
হযরত আলীর কর্মবহুল জীবন ক্ষেত্রে ব্যাপক ও গভীর জ্ঞান সাধনা সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য।
কোরআন, হাদীস ও ফিকাহ শাস্ত্রে তিনি ছিলেন বিদ্যার সাগর।
মহানবী (সঃ) বলেছেন- ‘আমি যদি জ্ঞান নগরী হই, তাহলে আলী সেই নগরীর দ্বার।’কাব্য চর্শ ও সাহিত্য চর্চা প্রাচীনকাল থেকেই আরবদেশে প্রচলিত ছিলো।
আক্ষরিক শিক্ষাদীক্ষার কোন ব্যবস্থা না থাকলেও আরবে বহু নামকরা কবি ছিলেন। তাঁর রচিত সুন্দর কবিতাগুলি ‘দেওয়ান-ই-আলী’ নামে খ্যাতি লাভকরেছিলো। আজো বহু জ্ঞান পিপাসু মানুষ তাঁর ‘দেওয়ান-ই-আলী’ থেকে জ্ঞানের অমৃত ধারা আহরণ করে থাকেন।
হযরত আলী (রাঃ)-এর শৈশব ও শিক্ষা-দীক্ষা-
মক্কার বিখ্যাত কোরায়েশ বংশের শ্রেষ্ঠ শাখা হাসেমী গোত্রের সরদার ছিলেন মহামতি আবদুল মোতালিব।
তিনি একদিক দিয়ে যেমন ছিলেন সম্মানিত এবং সকলের পূজনীয়, তেমনি ছিলেন ধর্ম বিষয়ক উপদেষ্টা। পবিত্র কাবা গৃহের সেবায়েত ও রক্ষণাবেক্ষনকারী ছিলেন তিনি।
আবদুল মোতালিবের দশজন পুত্র সন্তান ছিলেন। তাদের মধ্যে আবদুল্লাহ, আবু তালিব, আবু লাহাব, হামজা, আব্বাস সমধিক ও সদ্ধ ছিলেন।
মহামতি আবদুল্লাহর ঔরশেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন সাইয়্যেদিন মুরছালিন, খাতেমুন্নাবেঈন মাহবুবে খোদা মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সঃ)।
সদাশয় আবু তালিবের ঔরশে জনন্মগ্রহণ করেছিলেন শেরে খোদা হযরত আলী কারামুল্লাহ (রাঃ)। হযরত আলী শৈশবকাল থেকে ছিলেন জ্ঞান পিপাসু এবং বিদ্যানুরাগী। কিন্তু তাঁর পিতা আবু তালিব তেমন স্বচ্ছল ব্যক্তি ছিলেন না। সামান্য ক্ষুদ্র ব্যবসা বাণিজ্য করে তাঁর সাংসারিক ব্যয়ভার নির্বাহ হতো। নিজের সন্তানাদির সংখ্যা ছিলো অধিক। তার উপর আবদুল মোতালিবের মৃত্যুর পর শিশু মোহাম্মদের (সঃ) লালন পালনের ভারও তাঁর উপর পড়েছিলো। তাই সর্বাধিক শিক্ষা-দীক্ষার প্রতি তিনি বিশেষ নজর দিতে পারেননি।
শিশুকাল থেকেই হযরত আলী ক্রীড়া-কৌতুক এবং নানারূপ শক্তির প্রতিযোগীতার প্রতি বিশেষ আসক্ত ছিলেন। বাল্যকালেই তিনি যুদ্ধ বিদ্যায় পারদর্শী হয়ে উঠেছিলেন। সঙ্গী সাথীদের সঙ্গে তলোয়ার, ধনুক ইত্যাদির দ্বারা খেলা করাই ছিলো তাঁর নেশা। অনেক সময় লাঠি সোটা, ঢাল-তলোয়ার নেজা-বল্লম ইত্যাদি নিয়ে নানারূপ ক্রীড়া কৌতুক করতেন হযরত আলী (রাঃ)।
অমিত তেজ, বিক্রম ও সাহসীকতার বীজও তাঁর অন্তরে বাল্য কালেই অঙ্কুরিত হয়েছিলো। পরবর্তী জীবনে তিনি সাহসী বীর পুরুষ, শক্তিমান ও সমর কুশলীরূপে প্রসিদ্ধ লাভ করেছিলেন, এসবের মূল ভিত্তি ঐ সমস্ত বাল্য ক্রীড়ার মধ্য দিয়েই দৃঢ় হয়েছিলো। শৈশবকাল থেকেই তাঁর স্মৃতি শক্তি ছিলো খুব প্রখর। একবার যা শুনতেন তা তিনি সহজে স্মরণ রাখতে পারতেন। তখনকার দিনে আরব ছিলো কবিতার দেশ। ছেলে বুড়ো সবাই নানারূপ কবিতা আবৃত্তি করে আনন্দ উপভোগ করতো।
হযরত আলীও ছেলেবেলা থেকে কবিতার প্রতি বিশেষভাবে আসক্ত ছিলেন। পরিণত বয়সে তিনি বহু জ্ঞানগর্ব কবিতা রচনা করেছিলেন। বিবি খাদীজাকে বিয়ে করার পর হযরত রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন নিজে উপার্জনক্ষম হলেন তখন চাচার দারিদ্রতা লক্ষ্য করে তিনি হযরত আলীকে নিজের সংসারে নিয়ে এসেছিলেন।
রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আলীকে গভীরভাবে ভালবাসতেন। তিনি ছিলেন হযরতের নয়নের মণি ও নিত্য সঙ্গী। তাই স্বাভাবিকভাবেই রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে দৈনন্দিন কাজ, কাম, আদব-কায়দা, আলাপ-আলোচনা অনেক কিছুই সুন্দরভাবে শিখিয়েছিলেন।
রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন নবুয়ত লাভ করেছিলেন তখন হযরত আলীর বয়স মাত্র দশ বৎসর ছিলো।
একদিন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেন যে মহান আল্লাহ এই ত্রিভুবন সৃষ্টি করেছেন এবং লালন পালন করছেন, আমরা সেই মহাপ্রভুর নিকট কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলাম। আচ্ছা আলী, তুমি কি আমাকে বিশ্বাস কর।
হযরত আলী বললেন, হযরত! আমি আপনাকে অন্তরের সহিত বিশ্বাস আর ভক্তি করি। আপনি আমাকে দীক্ষা দিন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) খুশী হয়ে সেই মুহূর্তেই তাঁকে সত্য ধর্ম ইসলামে দীক্ষা দিলেন। কালেমা পাঠ করালেন- ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মোহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ।’ এইভাবে দীক্ষা নিয়ে ইসলাম ধর্মে সর্বপ্রথম বালক মুসলমান হলেন হযরত আলী। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট দীক্ষা গ্রহণ করে তিনি এক নূতন মানুষে রূপান্তরিত হলেন।
হিজরতে হযরত আলী (রাঃ)-এর বীরত্ব-
আল্লাহর প্রত্যাদিষ্ট সত্যধর্ম ইসলাম প্রচার করতে গিয়ে কুরাইশদের দুর্বিসহ অত্যাচার, অবিচার, লাঞ্চনা ও অপমান রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর জীবনকে ভয়ঙ্কর বিপদসঙ্কুল করে তুলেছিলেন। সামান্য কিছু সংখ্যক নওমুসলিমদের জীবনও মহা সংকটের মধ্যে অতিবাহিত হচ্ছিলো কুরাইশগণ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে হত্যা করার জন্য ষড়যন্ত্র করলো। দলপতিগণ মিলে পরামর্শ করলো- সকলে মিলে রাত্রিবেলা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ঘরটি ঘেরাও করে রাখবে। ভোরবেলা ঘর থেকে বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে হত্যা করা হবে। আল্লাহ তাঁর রাসূলকে রক্ষা করার জন্য ‘ওহী’ দ্বারা কুরাইশদের ষড়যন্ত্রের কথা জানিয়ে দিলেন এবং মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করার জন্য নির্দেশ দিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) নওমুসলিমদেরকে মদীনায় পাঠিয়ে দিয়ে নিজেও হযরত আবুবকরকে সঙ্গে নিয়ে রাত্রিবেলা মদীনার পথে রওয়ানা হলেন। কুরাইশগণ এ সংবাদ জানতে পারলো না। পূর্ব পরামর্শ মতো তাঁরা রাত্রিবেলা এসে হযরতের ঘরটি ঘেরাও করে অপেক্ষা করতে লাগলো।
রাসূলুল্লাহ (সঃ) চলে যাওয়ার পরপরই হযরত আলী তাঁর বিছানায় এসে শুয়ে রইলেন এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) যাতে নির্বিঘ্নে মদীনায় পৌঁছাতে পারেন, সেজন্য খোদার দরবারে আরজ করতে লাগলেন।
এদিকে কোরাইশগণ সারারাত জেগে রাসুলুল্লাহর বাসগৃহ ঘেরাও করে পাহরা দিলো। রাত ভোর হলো। চারদিক পাখীদের কলকাকলীতে জেগে উঠলো। আস্তে আস্তে সূর্যও উদিত হলো।
কিন্তু কেউ বাইরে এলেন না। কুরাইশগণ অস্থির হয়ে উঠলো। অবশেষে তারা খোলা তরবারি হাতে রাসূলুল্লাহর (সঃ) বাসগৃহে প্রবেশ করলো এবং শয্যায় হযরত আলীকে শায়িত দেখে ভাবলো, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-ই শুয়ে আছেন। তাই চীৎকার করে বললো-মোহাম্মদ! আজ তোমার রক্ষা নেই। আমরা তোমাকে হত্যা করবো।
তাদের চীৎকার শুনে হযরত আলী শয্যায় উঠে বসলেন এবং বললেন-তোমরা সবাই এখানে জটলা পাকিয়ে কেন এসেছো?
কি চাও?
কুরাইশগণ আলীকে দেখে ক্রোধকণ্ঠে বললো, আমরা মোহাম্মদকে চাই।
মোহাম্মদ কোথায়?
হযরত আলী অকুতোভয়ে বললেন- তোমরা সারারাত জেগে পাহারা দিলে তবুও জানতে পারলে না তিনি কোথায় আছেন। তাঁর খবর আল্লাহই জানেন। এই বলে হযরত আলী ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। কুরাইশগণ বৃথা আক্রোশে বকাবকি করে ধীরে ধীরে চলে গেল। হযরত আলী সেইদিনই রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ঘরে যেসব আমানতী জিনিসপত্র ছিলো, তা উহার মালিকদের নিকট ফেরত দিয়ে দিলেন। পরদিনই কুরাইশদের চোখে ধুলো দিয়ে হযরত আলীও মদীনার পথে যাত্রা করলেন।
ওহোদের যুদ্ধে হযরত আলী (রাঃ)-
ইসলামের মঙ্গলের জন্য হযরত আলী নিজের জীবন পণ করে বার বার মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা ধরেছেন। ওহোদের যুদ্ধে মুসলমানদের চেয়ে কাফেরদের সৈন্য সংখ্যা ছিলো প্রায় দশগুণ বেশী।
এ যুদ্ধে হযরত আলী অসীম সাহসিকতার সহিত যুদ্ধ করেছিলেন। তার জুলফিকার নামীয় তরবারীর আঘাতে বহু শত্রু সৈন্য নিহত হয়েছিলো। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সঙ্গে থেকে হযরত আলী শত্রুর ভীষণ আক্রমণ বানচাল করে দিয়ে ছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশতঃ এই যুদ্ধে মুসলমানদের প্রভুত ক্ষতি সাধিত হয়েছিল। কারণ, যুদ্ধক্ষেত্র একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পার্শ্ব শত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষার ভার ছিল একদল লোভী মুসলিম সৈন্যবাহিনীর উপর। কাফের সৈন্যগণ যখন রনভঙ্গ দিয়ে পালিয়ে যাচ্ছিলো, তখন তারা দায়িত্ব ভুলে গিয়ে পরাজিত শত্রুবাহিনীর ধনমাল লুটতরাজে মগ্ন হয়ে পড়েছিল। তাই শত্রুবাহিনী সুযোগ পেয়ে সেইদিক দিয়ে পুনরায় মুসলিম বাহিনীর উপর তুমুল বিক্রমে আক্রমণ চালিয়েছিল।
মুসলিম বাহিনী এবার প্রাণপণে যুদ্ধ করেও তাদের আক্রমণ প্রতিহত করতে পারলেন না।
শত্রু সৈন্যগণ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে হত্যা করবার জন্য চেষ্টায় মেতে উঠেছিল। হযরত আলী রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পার্শ্বে থেকে তুমুল বিক্রমে যুদ্ধ করেছিলেন। তা সত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দেহে ভীষণ আঘাত লেগেছিল। তাঁর পবিত্র দাঁতও শহীদ হয়েছিলো।
যুদ্ধ শেষে হযরত আলী ও বিবি ফাতেমা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ক্ষতস্থানগুলি ধৌত করে ঔষধ লাগিয়ে দিয়েছিলেন। এ যুদ্ধে হযরত আলীও ভীষণভাবে আহত হয়েছিলেন। লোভী মুসলমানদের সামান্য ভুলের জন্য বহু ক্ষতি সাধিত হয়েছিল।
হযরত আলী (রাঃ) মহানুভবতা-
একবার কোন একটি খন্ডযুদ্ধে হযরত আলীর সঙ্গে ভীষণ শক্তিশালী এক কাফের যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিলো।
উভয়ের মধ্যে তলোয়ার, নেজা, বল্লম ইত্যাদি দ্বারা অনেকক্ষণ যুদ্ধ চললো। কিন্তু উভয়েই সমান সমান ছিলো। হযরত আলী অবশেষে ভীষণ হাঁক দিয়ে শত্রুকে তুমুল বিক্রমে আঘাত করলেন।
তাঁর হায়দারী হাঁকে কাফের সৈন্যটি দুর্বল হয়ে গেলো এবং ভীষণ আঘাত সহ্য করতে না পেরে ভতলশায়ী হলো। তৎক্ষনাৎ হযরত আলী শত্রুর উপর ঝাপিয়ে পড়লেন এবং বুকের উপর চড়ে বসলেন। কাফের সৈন্য বুঝতে পারলো এবার আর রক্ষা নেই। মৃত্যু তার অবধারিত। হযরত আলী কোমর বন্ধ থেকে খঞ্জর বের করে কাফেরের বুকে বিদ্ধ করতে উদ্ধত হলেন। মৃত্যু ভয়ে কাফের সৈন্যটি ভীষণ স্বস্ত্রস্ত হয়ে উঠল। প্রাণ রক্ষার জন্য দিশেহারা হয়ে হযরত আলীর মুখে থুথু নিক্ষেপ করল।
কাপুরুষ কাফের সৈন্যের এমন আচরণে হযরত আলী স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। ঘৃনায় তিনি তাকে ছেড়ে দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। বললেন যা কাফের! কাপুরুষ! তুই মুক্ত। হযরত আলীর এই ব্যবহারে কাফেরটিও ভীষণ বিস্মিত হলো। বললেন- তুমি আমাকে হত্যা না করে ছেড়ে দিলে কেন?
হযরত আলী বললেন- তুমি ইসলামের শত্রু ছিলে বলে তোমাকে হত্যা করতে উদ্যত হয়েছিলাম। কিন্তু যখন তুমি আমার মুখে থুথু নিক্ষেপ করলে তখন তোমার উপর আমার ব্যক্তিগত আক্রোশ হয়েছিল।
মুসলমানেরা ব্যক্তিগত ক্রোধের জন্য কাউকে হত্যা করা হারাম মনে করে। সেজন্যই আমি তোমাকে মুক্তি দিয়েছি।
হযরত আলীর মহানুভবতা কাফেরের হৃদয় স্পর্শ করলো। সে তৎক্ষণাৎ কালেমা পড়ে মুসলমান হয়ে গেলেন।
হযরত আলীর দাম্পত্য জীবন-
হযরত আলী ও ফাতেমার দাম্পত্য জীবনে তারা কখনও পার্থিব নিরবচ্ছিন্ন সুখ-স্বাচ্ছন্দ উপভোগ করেননি সত্য, কিন্তু তারা প্রকৃত দাম্পত্য সুখ ও মানসিক শান্তি পরিপূর্ণভাবে ভোগ করছিলেন। কারণ স্বামী স্ত্রী উভয়েই রাসূলুল্লাহর অমূল্য শিক্ষা-দীক্ষায় পরিপূর্ণ ছিলেন।
পার্থিব লোভ-লালসা, ও বিলাশ-বাসনা তাঁরা সম্পূর্ণরূপে বর্জন করে চলতেন। অল্পে তুষ্টি, কষ্ট-সহিষ্ণুতা এবং ধৈর্য-সহ্যই ছিলো তাঁদের প্রধান স্বভাব। তদোপরি পরস্পরের প্রতি প্রগাঢ় ভালবাসা ও স্নেহ-মমতা তাদের বাহ্যিক দুঃখ-কষ্টের সংসাটিকে বেহেশতে পরিণত করে তুলেছিলো। সারি সারিয়াক হযরত আলী বিদ্যায়, বুদ্ধিতে, গৌরবে, সাহসে বিক্রমে ও বংশ মর্যাদার অন্যান্যদের তুলনায় শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি হয়েও বিবি ফাতেমার সঙ্গে সশ্রদ্ধ বিনম্র ও মধুর ব্যবহার করতেন।
বিবি ফাতেমাকে তিনি ভোগ-বিলাশে, সবন-ভূষনে সাজিয়ে রাখতে না পারলেও আদর, যত্ন ও ব্যবহার দ্বারা তুষ্ট রাখতে কখনও ত্রুটি করতেন না।
বিবি ফাতেমাও তাঁকে অত্যন্ত ভালবাসতেন এবং ভক্তি শ্রদ্ধাও করতেন। কোনদিন হযরত আলী ফাতেমার মতের বিরুদ্ধে কোন কাজ করেন নাই।
বিবি ফাতেমাও তাঁর সুযোগ্য স্বামীর সন্তুষ্টির জন্য জান-প্রাণ দিয়ে চেষ্টা করেছেন। স্বামীর অভাবের সংসারে নিজের উপর সাধ্যতিরিক্ত খাটুনীও বরণ করে নিয়েছেন।
স্বামীকে কখনও তিনি অন্যায় আব্দার করে বিব্রত করে তুলেননি। সংসারের বিভিন্ন কাজ কর্ম তিনি নিজের হাতেই সম্পন্ন করতেন।
হযরত আলী সবসময়ই ইসলামের খেদমত ও যুদ্ধ বিগ্রহ নিয়েই ব্যস্ত থাকতেন। তাই সাংসারিক আয় উন্নতির দিকে মনোযোগ দেবার সময় তাঁর হয়ে উঠতো না। অনেক সময় রুজি রোজগারের অভাবে তাদেরকে অনাহার-অর্দ্ধাহারেই কাটাতে হতো।
হযরত ফাতেমার গর্ভে হযরত আলীর তিনজন পুত্র সন্তান- হযরত হাসা হযরত হোসেন, হযরত মোহসীন এবং কন্যা সন্তান জয়নাব ও উম্মে কুলসুম জন্মগ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু পুত্র মোহসীন ও কন্যাদ্বয় অল্প বয়সেই মৃত্যুবরণ করেছিলেন। বিবি ফাতেমার জীবিতকালে হযরত আলীর অন্য বিয়ে সম্পরে ঐতিহাসিকদের বিভিন্ন মত দেখা যায়। হন্ন এক ল্য কেউ কেউ বলেছেন- হযরত আলী অন্যত্র বিয়ে করেও বিবি ফাতেমার ভয়ে সে স্ত্রীকে গৃহে না এনে অন্যত্র রেখেছেন। কেউ কেউ বলেছেন- ফাতেমা জীবিত থাকালীন আর কোন বিয়ে করেননি। এমনিভাবে ঐতিহাসিকদের বিভিন্ন মত দেখা যায়।
হযরত ওসমান ছিলেন মুসলিম রাষ্ট্রের তৃতীয় খলিফা। তিনি যেমন ছিলে সরল প্রকৃতির, তেমনি ছিলেন শান্তি প্রিয় মানুষ। তাই তাঁর পক্ষে সাধান আরবাসীগণকে শান্ত রাখা সম্ভব হয়নি।
তাঁর শাসনমালে এক শ্রেণীর লোকের মনে অশান্তি ধুমায়িত হয়ে উঠেছি তাই স্বাভাবিকভাবে রাজ্যে গোলমাল ও বিদ্রোহ দেখা দিলো। বিদ্রোহীগণ হযরত ওসমানকে হত্যা করবার ষড়যন্ত্রে মেতে উঠল। অবশেষে একদিন তারা খলিফাকে হত্যা করবার জন্য তাঁর বাসগৃহ অৱরোধ করে বসলো।
এই সময় হযরত আলী মদীনায় উপস্থিত ছিলেন। তিনি নানারূপ যুক্তি ও বুঝ পরামর্শ দিয়ে বিদ্রোহীদেরকে নিরস্ত্র করলেন। কিন্তু প্রকৃতি যাদের অসৎ ও উগ্র তারা শান্তির পথে আসবে কেন?
হযরত আলী জানতে পারলেন- বিদ্রোহীর। সেইদিন রাত্রেই হযরত ওসমানকে হত্যা করার জন্য তাঁর বাসগৃহে হানা দিবে। হযরত আলী তাঁর দুই পুত্র ইমাম হাসান ও হোসাইনকে খলিফার বাড়ী পাহারা দিবার জন্য পাঠিয়ে দিলেন।
হযরত আলী কিন্তু এতো করেও বিদ্রোহীদের ছোবল থেকে খলিফাকে রক্ষা করা গেল না। তারা নির্মমভাবে খলিফাকে হত্যা করল। তারপর হত্যাকারীগণই মদীনার সর্বময় কর্তা হয়ে দাঁড়াল।
তিনদিন পর্যন্ত নিহত খলিফার শবদেহ পড়ে রইল। কেউ দাফন করতে এলো না। মদীনায় তখন ভীষণ দুর্যোগ ও অরাজকতা চলছিল। খেলাফতের পদ কে গ্রহণ করবে তা নিয়ে ভীষণ গোলযোগ আর সমস্যার সৃষ্টি হলো। মদীনার চিন্তাশীল নেতৃবৃন্দ হযরত আলীকে খলিফার পদে আসীন হওয়ার জন্য ধরে বসলেন। কিন্তু তিনি এই দায়িত্বশীল পদে নিযুক্ত হতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করলেন।
অবশেষে মদীনার প্রধান সাহাবাগণ এবং মোহাম্মদ এবনে আবুবকর বললেন- আপনি সাধারণ মানুষের জানমাল নিরাপদ করুন। এই মহান দায়িত্ব আপনার উপর একান্ত ফরজ। হযরত আলী অতঃপর ৩৫ হিজরী সনের ২৪শে জিলহজ্জ তারিখে মদীনার খেলাফতের পদে নির্বাচিত হলেন।
ওসমান হত্যার প্রতিক্রিয়া –
হযরত আলী খেলাফতের পদে নির্বাচিত হয়ে দেখলেন সমগ্র আরবে তখন তুমুল অরাজকতা আর অনৈক্যের প্লাবন বইছে। তাই তিনি প্রথমে দেশের আভ্যন্তরীণ শান্তি ফিরিয়ে আনার জন্য আত্মনিয়োগ করলেন। মদীনার বৃহত্তর জনসাধারণ তার আনুগত্য স্বীকার করল।
কিন্তু ওসমান বিরোধী উমাইয়া বংশের লোকেরা তার আনুগত্য স্বীকার করল না। তারা অনেকেই মদীনা ত্যাগ করে সিরিয়া দেশে চলে গেলেন। তারা সাথে নিয়ে গেলেন হযরত ওসমানের রক্ত মাখা কাপড়। সে সময় বিদ্রোহীরা খলিফাকে হত্যা করবার জন্য হাতিয়ার দিয়ে আঘাত হানতে ছিল, তখন বেগম লায়লা স্বামীকে রক্ষার জন্য চেষ্টা করার সময় তাঁর হাতের কয়েকটি আঙ্গুল কেটে গিয়েছিল।
বিদ্রোহীগণ হযরত ওসমানের রক্ত রঞ্জিত কাপড় ও লায়লা বিবির কতিপয় আঙ্গুলগুলি দেখিয়ে সিরিয়াবাসীকে ওসমান হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণ করবার জন্য অনুপ্রানীত করতে লাগলো।
হযরত আলী ছিলেন হাসেমী বংশের লোক। তাই প্রথম থেকেই উমাইয়া বংশের লোকগণ তার সঙ্গে শত্রুতা করতো। প্রাবীন সাহাবী তালহা ও জোবায়ের এসে হযরত আলীকে ওসমান হত্যাকারীদেরকে শাস্তি দেবার জন্য প্রস্তাব দিলেন।
হযরত আলী সত্যিকারের হত্যাকারীদের সন্ধান ও শাস্তি দানের প্রতিশ্রুতি দিলেন বটে, কিন্তু বললেন, বর্তমানে এ কাজে হস্তক্ষেপ করা ঠিক হবে না। কারণ ওরা এখন বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। তাছাড়া বিপ্লবী ও হত্যাকারী দুই দল একইরূপ অপর।বী নয়। তাই বর্তমানে এ কাজে হস্তক্ষেপ করা ঠিক হবে না। বর্তমানে আভ্যন্তরীণ গোলযোগ এবং যেসব প্রাদেশিক শাসনকর্তাগণ খেলাফতের বশ্যতা স্বীকার করতে নারাজ, তাদেরকে বাধ্য করানো উচিত। তালহা ও জোবায়ের খলিফার সহিত একমত হতে পারলেন না। তারা বিষয়টাকে অন্যরূপ ধারণা করলেন, অনেকে এমন কথাও প্রচার করলো যে ওসমান হত্যার সঙ্গে আলীর যোগাযোগ রয়েছে, তাই এ বিষয়টাকে তিনি ধামাচাপা দিতে চেষ্টা করছেন। তাই তালহা ও জোবায়ের হত্যাকারীদেরকে শাস্তি দেবার জন্য মক্কায় চলে গেলেন।
মওলা আলীর অকালমৃত্যু-
এইসব যুদ্ধ বিগ্রহ দেখে খারেজী সম্প্রদায় ধারণা করলো- হযরত আলী, মাবিয়া ও আমর ইবনুল আস ক্ষমতার লড়াইয়ে মগ্ন হয়ে যেভাবে জন ক্ষয় করে চলেছেন, তাতে সাধারণ মানুষের জীবনে হতাশা নেমে এসেছে। এতে অল্প সময়ের মধ্যেই মুসলমানগণ ধরাপৃষ্ঠ থেকে মুছে যাবে।
তাই তারা সবাই মিলে পরামর্শ করলো- এই তিনজনকেই দুনিয়া থেকে চিরবিদায় করে দিতে পারলেই দেশে শান্তি স্থাপন সম্ভব হবে এবং কলহ-বিবাদ চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে।
দীর্ঘ বৈঠকের পর সাব্যস্থ হলো-তিনজনকেই একই দিনে, এক সময়ে হত্যা করা হবে। তারপর জনসাধারণের মতামত গ্রহণ করে নতুন খলিফা নির্বাচিত করা হবে।
হযরত আলীকে হত্যা করার দায়িত্ব নিল আবদুর রহমান নামে একজন খারেজী এবং বার্ক নামীয় খারেজী মাবিয়াকে আর আমর নামক খারেজী আমর ইবনুল আসকে। তাদের সিদ্ধান্ত মত ২১ই রমজান তারিখের ভোরবেলা ফজবের নামাজের সময়েই তিনজনকে হত্যা করা হবে।
আবদুর রহমান খারেজী ২০ই রমজান তারিখে কুফায় উপস্থিত হয়ে মসজিদে লুকিয়ে রইলো।
২১ই রমজানের ছোবেহ সাদেকের সময় হযরত আলী মসজিদে ইমামতি করবার জন্য জায়নামাজে এসে দণ্ডায়মান হলেন। ঠিক সেই মুহূর্তেই পাষণ্ড আবদুর রহমান খারেজী ছুটে এসে তাকে প্রচণ্ড আঘাত করলো।
সেই আঘাতেই হযরত আলী জায়নামাজেই লুটিয়ে পড়লেন। ধীরে ধীরে তাঁর মহান আত্মা ইহলোক ত্যাগ করে প্রিয়তমা মরহুমা পত্নী ফাতেমা (রাঃ) নিকটে চলে গেলো।
নির্ধারিত দিনেই মাবিয়ার হত্যাকারী মাবিয়াকে হত্যা করতে গিয়ে ধরা পড়লো। হত্যাকারীর মৃত্যুদণ্ড হলো। আমর ইবনুল আস সৌভাগ্যক্রমে সেদিন মসজিদে উপস্থিত ছিলেন না। তাই তিনিও বেঁচে গেলেন।
হযরত আলী ছাপান্ন বৎসর বয়সেই ইহলোক ত্যাগ করেছিলেন। মাত্র চার বৎসর, নয়মাস কাল খেলাফতের শাসন দণ্ড পরিচালনা করেছিলেন। কিন্তু খেলাফত জীবনে একটি দিনও তিনি শান্তি স্বস্থিতে অতিবাহিত করতে পারেননি। (সংকলন)
Leave a Reply